ইরফানা সামিয়া
2019/02/03

ইরফানা সামিয়া

শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী এবং কাউন্সেলর

ন্যাশনাল ইন্সট্রাক্টর, ইয়ুথ মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড।


বাবা-মায়ের প্রত্যাশা বনাম সন্তানের আত্মবিশ্বাস


 

প্রানোচ্ছ্বল, হাসিখুশি একটি মেয়ে রমা (ছদ্মনাম)। ক’দিন পর তার এইচ,এস,সি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবে। অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দিন কাটছে তার। মা বাবার স্বপ্নপূরণ, জীবনে অনেক বড় কিছু হতে হবে এই প্রত্যাশা পূরণে দিন গুনছে সে।সর্বোপরি পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল চাই ই চাই! পরীক্ষার ফল প্রকাশ হল কিন্তু রমার স্বপ্নপূরন হল না। রমা পাশ করেছে বটে, তবে খুব একটা ভালো সে করতে পারেনি। শুরু হল রমার জীবনে নতুন আরেক পরীক্ষা। ফল প্রকাশের পর থেকে মা কথা বন্ধ করে দিল এবং প্রায় এক মাস মা তার সাথে কোন কথা বলেন নাই!বাবাও কঠিন স্বরে কথা বলছে এবং রমার পড়াশুনার পেছনে তাঁদের প্রচেষ্টা, আর্থিক ব্যয় আর ভালো ফলাফল না করায় তাঁদের প্রত্যাশা ভঙ্গ এবং সমাজের লোকের বিদ্রুপ দৃষ্টির কথা বাবা মনে করিয়ে দিচ্ছে বারংবার। রমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে কেউ। এই প্রানোচ্ছ্বল মেয়েটি হয়ে গেল নিষ্প্রভ, চুপচাপ। অজানা একটা ভয় ঘিরে রাখল তাকে, মনে হল- সে খুব খারাপ একটা মেয়ে। বাবা মাকে সে ছোট করে ফেলল সবার কাছে। বাবা মা তাকে আর কখনও ভালোবাসবে না, কখনও বুকে টেনে বলবে না, আমার সন্তানের জন্য আমি গর্বিত, মা বোধ হয় কখনও তার সাথে আর কথা বলবে না। এসব ভেবে প্রচন্ড ঘামতে শুরু করে সে, বুকের ভেতরটা চাপ মেরে ওঠে। এত বড় পৃথিবীতে এখন তার নিজেকে খুব একা মনে হয়!

এইচ,এস,সি পাশের পরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেল রমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকে শুরু হল রমার জীবনের আরেকটি অধ্যায়। যে অধ্যায়ে রয়েছে আবারও প্রত্যাশা পূরণের চাপ! রমা উঠে পড়ে লাগল তার প্রতি তার বাবা-মায়ের ধারনা পরিবর্তনের জন্য। সে নিয়মিত ক্লাস করত, নিজে পড়াশুনাও করত। কিন্তু পরীক্ষার হলে গেলেই, তার মাথা ফাঁকা মনে হত। হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত, হাত পা কাঁপতে শুরু করত, যার ফলে সে পরীক্ষার খাতায় নিজেকে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হত।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রমা স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাশ করল।পরীক্ষার ফল অতটা খারাপ হয়নি তবে নিজের প্রতি আত্নবিশ্বাসটা কোথায় যেন নড়বড়েই থেকে গেল। একটি স্কুলে চাকরি পেল রমা। সেখানেও পিছু নিল তার পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং নেতিবাচক চিন্তা। যেমনঃ একদিন এক সহকর্মী তার কিছু কাজে রমাকে সাহায্য করতে বলল। কিন্তু সেদিন রমা শারীরিকভাবে অসুস্থবোধ করছিল এবং সহকর্মীর কাজগুলো রীতিমত আরেকটি চাপ মনে হচ্ছিল। কিন্তু রমা সেই অতিরিক্ত চাপটি গ্রহন করে সহকর্মীর কাজটি করে দিয়েছিল। কারন তার ভেতরের ভয় তাকে বলছিল যে, যদি সে সহকর্মীর কথা না শোনে বা তার প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম হয়, তাহলে হয়তবা সহকর্মী তার সাথে খারাপ আচরণ করবে এবং কথা বলা বন্ধ করে দিবে!মানসিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে লাগলো রমা।এমতাবস্থায় রমা একজন শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হলেন

প্রকৃতপক্ষে, রমা তার অতীতের অভিজ্ঞতার প্রভাব থেকে বের হতে পারছিল না। কারন এইচ,এস,সি পরীক্ষার রেজাল্টের পরবর্তী সেই অতীত অভিজ্ঞতা তার ভিতর আত্নবিশ্বাসহীনতার জন্ম দিয়েছিল, জন্ম দিয়েছিল ব্যর্থতার গ্লানি এবং ভালোবাসা হারানোর ভয়। কারন তখন বাবা মায়ের নেতিবাচক আচরণ রমার ভেতরের সত্ত্বাকে যেমন নাড়িয়ে দিয়েছিল আবার ঠিক তেমনিভাবে একটা জায়গায় তাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। অথচ রমার মায়ের কিন্তু পরিবর্তন হয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে মা আবার কথা বলা শুরু করেছিলেনকিন্তু রমার অবচেতন মনে মায়ের সেই নেতিবাচক আচরণ দানা বেঁধে রইল বছরের পর বছর! রমা তার নিজের প্রতি নিজের নেতিবাচক চিন্তা ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশের পুনরাবৃত্তি করছিল বর্তমান সময়ে।

কেউ কেউ বলতে পারেন যে, বাবা মা তো সন্তানের ভালোর জন্যই বকাঝকা করে বা রাগ করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাবা মায়ের উদ্দেশ্যটা সন্তানের মঙ্গল কামনা হলেও, সন্তানের প্রতি তাঁদের আচরণের ধরনটা কিন্তু সবসময় মঙ্গলজনক নয়। রমার ঘটনায় আলোকপাত করা হলে দেখতে পাই যে, ১৫-১৬ বছর বয়সের একটা মেয়ে যখন তার বয়সন্ধিকালের  শারীরিক এবং মানসিক অগনিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার জীবনের বিশেষ একটি মুহূর্ত তাকে শোনাল কিছু নেতিবাচক বার্তা। বয়ঃসন্ধি এবং কৈশোরকালের সন্ধিক্ষণে যেখানে আত্নধারনার এবং আত্নমর্যাদার উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, আত্নবিশ্বাসী ও আত্ননির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেখানে নিজেকে সে দেখতে পেল বিফল, খারাপ, ক্ষুদ্রকায় একজন মানুষ হিসেবে

কারন বয়ঃসন্ধিকাল একটা মানুষের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় যখন মানুষ একটা বড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। আর তখন যদি মানুষের ভেতর নেতিবাচক দিকগুলোকে জোড় দিয়ে তাকে হেয় করা হয়, তার দুর্বলতাকে প্রকাশ করা হয়, তাহলে মানুষটি তার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা এবং আত্মবিশ্বাসহীনটা নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করে।

বলছি না সবার ক্ষেত্রে বিষয়টা একই রকম হবে। এক একজন মানুষের অভিজ্ঞতা এবং পারিপার্শ্বিকতা একেক রকম। তবে বয়ঃসন্ধিকালের এই পরিবর্তনগুলো গবেষণালব্ধ।

জীবনের একটি পরীক্ষায় খারাপ করলে হয়ত তার কিছু নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী পর্যায়ে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এর মানে এই না যে, ঐ একটি পরীক্ষার বিফলতা পুরো জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। চেষ্টা, একগ্রতা, ধৈর্য, অধ্যাবসায় থাকলে যে কোন পরিস্থিতি থেকেই উত্তরন সম্ভব। একটি খারাপ ফলাফলের প্রভাব যদি পুরো জীবনটাকে তছনছ করে দেয়, তাহলে জীবনের অর্থবহতা থাকে না, জীবনের স্বাদ হারিয়ে যায়।

এক্ষেত্রে বাবা মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তাঁদের সন্তান নিজে স্বপ্ন দেখতে শিখছে না কি বাবা মায়ের স্বপ্নপূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নভঙ্গের গ্লানিতে ভুগছে! বাবা মায়ের প্রত্যাশার চাপে পিষ্ট হয়ে অনেক সন্তানের আত্নার ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া আমরা প্রায়ই আমাদের চারপাশে দেখতে পাই।

আমি বলছি না প্রত্যাশা থাকবে না কিন্তু তা হতে হবে বাস্তবিক। সবসময় সবকিছু আশানুরূপ নাও হতে পারে। সেটাকে গ্রহন করা এবং অবস্থার উন্নয়নের অন্যান্য উপায়গুলো নিয়ে ভাবাই হচ্ছে বাস্তবিক। তাই বাবা মাকে প্রথমত তাঁদের প্রত্যাশার বাস্তবিকতা এবং প্রত্যাশা ভঙ্গের পর আচরনের যথার্থ প্রকাশ ভঙ্গি নিরুপন করতে হবে। একটি পরীক্ষায় খারাপ করার ফলে বাবা/মায়ের এক মাস কথা বন্ধ রাখা কোন যৌক্তিক ভাব প্রকাশের উপায় নয়। বরং সন্তানের দুঃসময়ে তাদের পাশে থেকে সহমর্মিতার হাতটি বাড়িয়ে দিতে হবে। এবং তাদেরকে প্রথমত, তাঁদের সন্তানের ভেতরের গুনের/শক্তির জায়গাগুলোকে দেখতে সাহায্য করতে হবে। জীবনের টানাপোড়েনে বিফল হলে কিভাবে সে তার গুণ গুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করবে, সেটা নিয়ে বাবা মা খোলামেলা কথা বলতে পারেনসমালোচনা করলেও সেটা হতে হবে গঠনমূলক।

আর এক্ষেত্রে সন্তানকেও বুঝতে হবে, যে সর্বোপরি বাবা-মাও মানুষ এবং তারা সবসময় নির্ভুল হবেন সেটা নয়। তাঁদের আচরনের নেতিবাচক প্রভাবটাকে এড়িয়ে যদি তাঁদের উদ্দেশ্যের ইতিবাচক আবেদনটাকে উপলব্ধি করা যায়, তবে সবার জন্যই তা মঙ্গলজনক। রমার ঘটনা থেকে দেখেছি যে অতীতের নেতিবাচক স্মৃতি ভবিষ্যত সম্পর্কে ভয়ের, উদ্বিগ্নতার জন্ম দিয়েছিল এবং তার ফলে সে তার বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করতে পারছিল না। যে ঘটনা ঘটে যায় সেটা অতীত হয়ে যায়। আর অতীতের জন্য বর্তমানটাকে নষ্ট করার কোন মানে হতে পারে না।বরং বর্তমানকে উপভোগ করতে হবে এবং বর্তমানে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জোগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে আত্মবিশ্বাসের সাথে।

সমন্বয় ঘটুক প্রত্যাশা আর আত্মবিশ্বাসের...

(প্রথম প্রকাশঃবাংলাদেশ এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি সোসাইটি ম্যাগাজিন, ‘মনোময়’-প্রথম সংখা-জুলাই, ২০১৮ )

আরো পড়ুন