রিকভারি বা আরোগ্য কী?

 

রিকভারি বা আরোগ্য বলতে এখানে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে বোঝানো হয়েছে, সত্যিকারের বাস্তব জীবনে যারা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সব ধরনের প্রতিকূলতাকে স্বীকার করে তা জয় করতে আগ্রহী হয়েছেন বা করেছেন। আরোগ্য অবস্থা রোগের লক্ষণের অনুপস্থিতির চাইতে আরও বেশি কিছু নির্দেশ করে এবং ব্যক্তিভেদে এর অর্থের ভিন্নতা দেখা যায়।

খুব কঠিন মানসিক দুরবস্থা থেকেও মানুষ আরোগ্য পেতে পারে এবং পাচ্ছেও। অনেক ধরনের ফ্যাক্টর বা উপাদান আরোগ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নেটওয়ার্কের (পরিবার ও বন্ধুবান্ধব) সহায়ক ভূমিকা এবং শিক্ষা বা কাজের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখা। এ ছাড়া, চিকিৎসাসেবার মান ও সহজলভ্যতা এবং ভুক্তভোগীর ইচ্ছাশক্তি ও সামর্থ্য দ্বারাও তার আরোগ্য অনেকাংশে প্রভাবিত হয়।

কারো কারো ক্ষেত্রে আরোগ্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া বা এক লম্বা সফর, যার পথ সরলরেখার মতো সোজা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাধা-বিপত্তিপূর্ণ। যেহেতু মানসিক অসুস্থতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে, আরোগ্যের পথে যাত্রাটিও তাই ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন। কারো ক্ষেত্রে দ্রুত হয়, কেউ আবার বেশ দীর্ঘ সময় পার করে আরোগ্য লাভ করেন। 

আরোগ্য লাভ আশাবাদী হওয়ার একটি বার্তা দেয়। এ ধারণামতে, রোগের লক্ষণ যেটাই হোক, গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা নিয়েও একটি পূর্ণাঙ্গ ও সন্তুষ্ট জীবনযাপনের জন্য মানুষের সব ধরনের সুযোগ থাকা উচিত। জীবনের অর্থপূর্ণতা একেক ব্যক্তির কাছে একেক করকম হতে পারে এবং আরোগ্য লাভে ব্যক্তি সেই অর্থটি নতুন করে আবিষ্কার করেন। একই সঙ্গে তিনি আবিষ্কার করেন নিজের নতুন একটি পরিচয়, যা নির্ণীত কোনো রোগের অর্থের চেয়েও অনেক গভীর। অসুস্থতা রোগের কারণের ওপর নজর না দিয়ে আরোগ্য লাভ বরং ব্যক্তির শক্তি, আরো বেশি সহিষ্ণুতা ও মঙ্গলের দিকে তার অগ্রসরতাকে নির্দেশ করে।

আরোগ্যলাভের পন্থার কেন্দ্রে রয়েছে আশা। নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেলে অনেকেই আরো আশাবাদী হয়ে ওঠেন। এসব সুযোগের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসাপদ্ধতি ও নিজেকে সাহায্য করার উপযোগী পথ খুঁজে নেওয়ার স্বাধীনতা। তাই, আরোগ্যের প্রতি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জোর দেওয়ার অর্থ প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে সরে আসা, যেখানে পেশাদার হচ্ছেন বিশেষজ্ঞ, যারা আরোগ্যপন্থা নিয়ন্ত্রণ করেন। আরোগ্য প্রক্রিয়ার বর্তমান ধারণায়, পেশাদার ব্যক্তিদের দেখা হয় অংশীদার এবং সহায়ক হিসেবে, যারা ব্যক্তির কল্যাণে সহায়তা প্রদান করেন।

আরোগ্যলাভ একান্তই ব্যক্তিগত একটি প্রক্রিয়া। তবে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, সমাজের সর্বস্তরে আরোগ্যলাভের প্রত্যাশা থাকলে তা ব্যক্তির আরোগ্যে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থেকে কেউ সুস্থ হয়ে ওঠেন না। স্থানীয় সমাজে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর অর্থ হলো, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চারপাশের সবারই দায়িত্ব রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক অসুস্থতা ও ব্যক্তির কল্যাণ নিয়ে একটি সমাজ যে ধরনের মনোভাব ও বিশ্বাস পোষণ করে, তা ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার পথে শক্তিশালী প্রভাব রাখে।