এএসডি এবং পিটিএসডি কী?

 

অধিক মাত্রার মানসিক আঘাতের কারনে একজন ব্যক্তি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে ভুগে থাকতে পারে। অধিক মাত্রার মানসিক আঘাত সৃষ্টিকারী ঘটনার মধ্যে রয়েছে যৌন নির্যাতন, সন্ত্রাসী হামলা, গুরুতর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি।  মানসিকভাবে আঘাতকারী ঘটনা বলতে আমরা বুঝি যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যু, দুর্ঘটনা, নিপীড়ন বা  কোনো ভয়ানক ঘটনার মতো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। অধিক মাত্রায় মানসিক আঘাত সৃষ্টিকারী ঘটনার মধ্যে রয়েছে যৌন নির্যাতন, সন্ত্রাসী হামলা, গুরুতর প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন বন্যা, আগুন, ভূমিকম্প ও সুনামি)।

এএসডি ও পিটিএসডির লক্ষণসমূহ :


  •   সেই ভীতিকর অভিজ্ঞতা বারবার মনে করা;
  •   সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি ফিরে আসার পরিস্থিতিগুলোতে উদ্বেগ;
  •   এড়িয়ে চলার আচরণ (বিশেষ করে সেই স্মৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনা বা জায়গা);
  •  আবেগের জায়গায় জড়তা চলে আসা সুখ বা দুঃখ লাভের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন। কোনো     অভিজ্ঞতাকে পূর্ণ আবেগ দিয়ে অনুভব করার ক্ষমতা লোপ পাওয়া;
  •   অন্যান্য ব্যক্তি ও বাইরের জগতের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া;

যৌন নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা:


যৌন নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষত যতটা গুরুত্ব পায়, মানসিক ক্ষত ততটা পায় না। কিন্তু যৌন নির্যাতনের ফলে নির্যাতিত ব্যক্তির জীবন দুর্বিষহ করে তোলা নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। নির্যাতিত ব্যক্তির মধ্যে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নির্যাতনের, বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের ঘটনার আকস্মিকতায় নির্যাতিত ব্যক্তি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে নানা ধরনের আবেগীয় অস্থিতিশীলতা ও মানসিক অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। ব্যক্তি নিজেকে ঘটনার জন্যে দোষী মনে করেন, নিজেকে ছোট ও অসহায় মনে করেন, লজ্জা বোধ করেন, অপমানিত বোধ করেন এবং কান্নাকাটি করতে থাকেন। এ ধরনের অনুভূতিগুলো তাদের মনের মধ্যে প্রবল চাপ তৈরি করে। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যায়, তারা নিজেকে গুটিয়ে রাখেন, অনেক সময় আক্রমণ ও দোষারোপ করতে থাকেন। এই প্রবল মানসিক চাপের কারণে তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করে থাকেন। এ ছাড়াও, তাদের মধ্যে ভয়, দুঃস্বপ্ন, অনিদ্রা, খাওয়ার অরুচি দেখা দেয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয় ব্যাপকভাবে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ায় সারাজীবন ধরে নির্যাতিত ব্যক্তি নির্যাতনের মানসিক প্রভাব বয়ে বেড়ান। ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, তার আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে যায়। ফলে ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে ব্যক্তির পরনির্ভরশীলতা বেড়ে যায় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়। ব্যক্তির মধ্যে বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারসহ নানা মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণে কষ্ট হয়, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। নির্যাতিত নারীর নিজের ওপর নির্যাতনের এই তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যতীত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক রয়েছে। সেটি হচ্ছে নির্যাতিত নারীর সন্তানদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাবে সন্তানদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও মেয়েদের পুরুষের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, হতাশাগ্রস্ত হয়ে বেঁচে থাকাটা তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। আবার নির্যাতিত হবার আতঙ্কও তাদের তাড়া করে ফেরে। অনেক ক্ষেত্রে যে নারী বা মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তাকেই এই ঘটনার জন্যে দায়ী করার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। এতে নির্যাতিতের মানসিক অবস্থা আরো খারাপ হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর পক্ষে পরবর্তী সময়ে যৌনসম্পর্ক করার ক্ষেত্রে ভয়, অনীহা ও নানা ধরেনের সমস্যা দেখা দেয়। অবিবাহিতা মেয়েদের ক্ষেত্রে স্বামীর সাথে যৌনসম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভীতি লক্ষ্য করা যায়।

যারা নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের শিকার, তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই দিকটিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নির্যাতনের শিকার নারী বা মেয়েকে নির্যাতনের জন্যে দায়ী না করার জন্যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা দরকার। সমাজের সহানুভূতি নির্যাতিত নারীর জন্যে অনেক প্রয়োজন। এদের মানসিক সমস্যার নিরসনে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।